১০টি সহজ প্রক্রিয়ার রাজশাহী থেকে আপনার পাসপোর্ট তৈরি করে নিন!

একজন বাংলাদেশী হিসেবে সম্পূর্ণ নাগরিক হতে পাসপোর্টের গুরুত্ব অপরিসীম। আর দেশের বাহিরে যেতে চাইলে বা IELTS, GMAT, GRE সহ বিভিন্ন পরীক্ষা দিতেও পাসপোর্টের ভুমিকা অনেক। এক কথায় পাসপোর্ট ছাড়া আপনি এগুলোর কোনটিই করতে পারবেন না। আমার এই লেখাটি মূলত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট, RMC-এর ছাত্রছাত্রীদের জন্য। কিভাবে খুব সহজে, তেমন কোন ঝামেলা ছাড়াই, ১ টাকাও ঘুষ না দিয়ে নিজে নিজে রাজশাহী বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস থেকে পাসপোর্ট করাতে পারবেন সে বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা লিখছি মূলত-

১. আমার সর্বমোট ৩৬৫০ টাকা খরচ হয়েছিলো রাজশাহী থেকে পাসপোর্ট করানোর জন্য। সময় লেগেছিল ২ মাস ১০ দিনের মতো (ঘুষ ছাড়া করাতে একটু সময় লাগে, হাহাহা)।

২. যেসব জরুরী কাগজপত্র লাগবে (অবশ্যই আবেদন করার পূর্বেই সব কাগজপত্র জোগাড় করে রাখবেন)

  • পাসপোর্ট সাইজ ছবি (সাদা শার্ট পড়া যাবে না) ৪ টা
  • জাতীয় পরিচয়পত্র
  • চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট
  • ভার্সিটির পরিচয়পত্র
  • ভার্সিটির রেজিস্ট্রেশনের কাগজ(যেটিতে আপনার নিবন্ধন নাম্বার আছে)
  • SSC ও HSC-এর সার্টিফিকেট
  • অনলাইন জন্মনিবন্ধন কার্ড (না থাকলে সমস্যা নেই, এটি মূলত জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলে লাগে)

নোটঃ প্রত্যেকটি কাগজের কমপক্ষে ২ কপি ফটোকপি করবেন।

৩. সব কাগজ ঠিকঠাক থাকলে, ৩৪৫০ টাকা (৩ হাজার টাকা পাসপোর্টের এবং ৪৫০ টাকা ভ্যাট) নিয়ে চলে যান সাহেব বাজারের সোনালী ব্যাংকের পাসপোর্ট শাখাতে (পদ্মা গার্ডেনে যেতে বিদ্যুৎ হোটেলের ঠিক সামনেই)। এটি মূলত ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত খোলা থাকে। আর এখানে শুধু পাসপোর্টের টাকা জমা নেয়া হয়। রশিদ নেয়ার পর খুব সতর্কতার সাথে সেটি পূরণ করুন। নিজের নামের আগে যদি ( MD. ) থাকে তবে MD-এর পর ডট দিবেন না, আর অবশ্যই সব বড় হাতের অক্ষরে লিখবেন। টাকা জমা দিয়ে রশিদে সিল নিয়ে সোজা বাসায়/হলে/ম্যেসে চলে আসুন। আপাতাত এইদিনের জন্য কাজ এখানেই শেষ।

৪. বাসায় মোটামুটি ভালো ইন্টারনেট কানেকশন নিয়ে সুন্দরভাবে ল্যাপটপের সামনে বসে http://www.passport.gov.bd/ এই সাইটে চলে যান। তবে সব ইনফরমেশন আগেই তৈরি করে রাখবেন যাতে সব কাজ ঝটপট হয়ে যায়। এবার সাইটের একেবারে ডানপাশে দেখবেন লেখা আছে ONLINE MRP INSTRUCTION, এখানে অনলাইন আবেদনের সব নিয়ম কানুন আছে এটা ডাওনলোড করে নিন সাইটটি থেকে। এটা এবং সাইটের হোমপেজের ডিটেইলস ভালভাবে পড়ে একদম নিচে স্ক্রোল করলে দেখবেন বাম পাশে লিখা আছে I have read the above information and the relevant guidance notes. এটা মার্ক করে ডান পাশে দেখবেন লিখা আছে CONTINUE TO ONLINE ENROLLMENT,  এবার এখানে ক্লিক করলে আপনার ডিটেইলস লিখার একটা পেজ পাবেন। এখানে সব তথ্য পূরণ করে SAVE & NEXT বাটোমে ক্লীক করলে ২য় পেজ আসবে, এখাণে CONTACT INFORMATION এবং EMERGENCY CONTACT PERSON-এর ডিটেইলস দিয়ে আবার SAVE & NEXT বাটমে ক্লিক করতে হবে। এরপর পেমেন্ট ডিটেইলস-এর একটি পেজ আসবে, এখানে আপনার ঐ সোনালী ব্যাংকের টাকা জমা দেয়ার রশিদের ডিটেইলস দিতে হবে যেমন, তারিখ, ব্যাংকের নাম, রশিদের নাম্বার ইত্যাদি। এরপর SAVE & NEXT বাটমে ক্লিক করলে আপনার Application-এর Overview দেখতে পারবেন। খুব ভালো করে প্রত্যেকটা জিনিস দেখে নিন। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নামের বানান (নামের আগে MD. থাকলে MD এর পর ডট দেয়ার দরকার নাই)। সবকিছু ঠিক থাকলে SAVE & SUBMIT বাটমে ক্লিক করুন। এরপর আপনার ফাইলটি ডাওনলোড করে নিন। এটা প্রিন্ট করুন।

৫. এবার একদিন সকাল ১০টার পর সব কাগজপত্র ও আবেদন ফর্ম নিয়ে রাজশাহী পাসপোর্ট অফিসে চলে যান। পাসপোর্ট অফিসে ঢুকে নিচতলার ডানপাশের প্রথম রুমে (সম্ভবত ১০৩ নাম্বার রুম) ইনফরম্যাশন ডেস্কে একজন ভদ্রলোক (আসলেই ভদ্রলোক) বসেন (বাহিরে একটি তথ্য কেন্দ্র আছে ওটা না)। ওনাকে সব কাগজ দেখিয়ে বলবেন সব কিছু ঠিক আছে কিনা। আশা করি ঠিক আছে বলবেন।

৬.  এবার  যেকোনো একজন পরিচিত প্রফেসরের কাছ গিয়ে আপনার সব ডকুমেন্ট, ছবি ও পাসপোর্ট আবেদন ফর্ম সত্যায়িত করে নিবেন। প্রত্যেকটা কাগজ ২ কপি করে রাখবেন যাতে যেকোনো প্রয়োজনে সাথে সাথে ব্যাকআপে থাকে।

৭. এবার আবেদনপত্র জমা দেয়ার পালা। এইদিন সুন্দর একটা ফরমাল শার্ট পড়ে (সাদা কালারের শার্ট বাদে) খুব সকালে ১০ টার আগেই রাজশাহী পাসপোর্ট অফিসে চলে যান। অবশ্যই আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে যাবেন। গিয়ে আপনার কাগজ পত্র নিচতলাতে যেখানে সবাই জমা দেয় সেখানে জমা দিবেন। (কেউ আলগা পিরিত করতে আসলে, আই মিন, দালাল আসলে বলবেন, আমি অনলাইনে করেছি/ আমি নিজেই পারব/ আমার লোক আছে)। ও হ্যাঁ, জমা দেয়ার সময় বলবেন আপনি অনলাইনে পূরণ করেছেন। অনলাইনে পূরণ করলে ঝামেলা নাই বললেই চলে, তাড়াতাড়ি হয়, লাইনে দারাতে হয়না। আপনার আবেদনপত্র জমা দিলে ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা পর সেটা ভ্যারিফাই হয়ে আসবে এবং আপনার নাম ডাকলে INFO ভ্যারিফাই করে BIOMETRIC তথ্য নেয়ার জন্য আপনাকে নিচতলার BIOMETRIC তথ্য নেয়ার রুমে যেতে বলবে। এখানে সাধারনত ছোট লাইন থাকে। সকালে গেলে লাইন ছোট থাকে। এই একটা জায়গাতেই লাইনে দারাতে হতে পারে। সেখান থেকে আপনার ছবি ও আঙ্গুলের ছাপ নিবে। ফরমাল শার্ট মূলত ছবি তোলার জন্যই পড়ে আসবেন, তবে এটা বাধ্যতামূলক না, আপনি চাইলে অন্য যেকোনো পোষাকে আসতে পারেন। তবে ছবি তোলার সময় আপনার চোখে চশমা থাকা যাবে না এবং কান ঢাকা থাকা যাবে না (যারা হিজাব পড়েন তাদের জন্য)। BIOMETRIC তথ্য দেয়া হয়ে গেলে আপনাকে একটা স্লিপ দিবে। আপনার কাজ মূলত শেষ। স্লিপটা ভালভাবে রাখবেন। সেখানে একটা QR CODE থাকে আপনার আয়প্লিকেশন নাম্বারের।

৮. এবার পুলিশ ভ্যারিফিক্যাশনের পালা! ২/৩ দিন পর আপনাকে DSB থেকে কল করবে। প্রথমে বর্তমান ঠিকানায় ভ্যারিফিক্যাশন হবে। কল করে আপনার ঠিকানায় আসবে। এসে আপনার সম্পর্কে ডিটেইল শুনবে। কোন মামলা আছে কিনা, কেন পাসপোর্ট করাচ্ছেন ইত্যাদি। তারপর নিরলজ্জের মতো বলবে আসলে আমাদেরতো কিছু খরচ আছে, মানে টাকা দেন!!! ভদ্র ভাবে বলবেন এটা তার দায়িত্ব, আপনি স্টুডেন্ট, টাকা নাই, ব্লা ব্লা ব্লা। মানে একটু নেগসিয়েশন করতে হবে। আর সব থেকে ভালো হয় যদি কোন পরিচিত কেউ থাকে প্রশাসনে! আমার কাছে যখন টাকা চাইছিল আমি ফোন ধরিয়ে দেই। তারপর আর কি! তিনি সক্স আমি রক্স! বর্তমান ঠিকানায় কাজ শেষ। আপনার স্থায়ী ঠিকানা যদি বর্তমান ঠিকানার চেয়ে ভিন্ন হয় তাহলে ২ জায়গাতেই ভ্যারিফিক্যাশন হবে। স্থায়ী ঠিকানার DSB থেকে কিছু দিন পর আবার কল দিবে। এরা বেশিরভাগ সময় আপনার বাসায় ও যাবে না। বিকাশে টাকা চাইবে। ঐ একই কাহিনী। আমাকে আমার চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট ফ্যাক্স করে দিতে বলছিল। আমি বেশি বুঝে দেইনাই, বলছিলাম সব কাগজ পত্র দেয়া আছে, আমি ভাবছিলাম এটা এমনিতেই টাকা নেয়ার ধান্দা। কিন্তু কোন কাগজ চাইলে সাথে সাথে দিয়ে দিবেন। যাই হোক এভাবে ১ মাস গেল, ২ মাস ও প্রায় শেষ। মেজাজ টাই গরম হয়ে গেছে এতো দিন হল এখনো পাসপোর্টের কোন খোঁজ নাই। পড়ে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে শুনি আমার পুলিশ ভ্যারিফিক্যাশন রিপোর্ট আসেনাই। এর মাঝে পরলাম আরেক ঝামেলায়, যে SI/OC DSB থেকে ফোন করেছিল এতদিনে তার নাম্বার হারিয়ে ফেলছি। পড়ে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করে সেই DSB অফিসের কন্টাক্ট নাম্বার জোগাড় করি। পুলিশ কন্ট্রোল রুম বেশ হেল্পফুল। তারপর ফোন দিয়ে শুনি সেই SI/OC ট্রান্সফার হয়ে চলে গেছে আমার রিপোর্ট জমা না দিয়েই। তখন কেমন লাগে বলুন, পড়ে নতুন যে আসছে তাকে ফোনে বোঝানর পর সে চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট ফ্যাক্স করে দিতে বলল। আমি সাথে সাথে পাঠিয়ে দিলাম। পরের দিন বলল সে রিপোর্ট পাঠিয়ে দিছে। আসলে এর আগে ভুলটা আমারি ছিল, চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট আগের SI/OC চাওয়ার সময়ই দেয়া উচিৎ ছিল। তাহলে তখনি হয়ে যেত।

৯. এবার কিছুদিন পর আপনার মোবাইলে ম্যেসেজ আসবে এবং ইমেইল ও আসবে, যে আপনার পাসপোর্ট তৈরি হয়ে গেছে। এরপর পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে আপনার ঐ স্লিপ টা দেখিয়ে সবুজ পাসপোর্টটি নিয়ে নিন!

১০. খুশি হওয়ার আগে ভালো করে পাসপোর্টটি দেখে নিন কোন বানান ভুল আছে কিনা। ভুল থাকলে সাথে সাথে কর্তব্যরত ব্যাক্তিকে বলুন। ভুল থাকলে সাধারনত অল্প কিছু টাকা চার্জ করে ৫/৬ দিনের মধ্যে সেটা সংশোধন করে দেয়। আর কোন ভুল না থাকলে তো কথাই নেই, পেয়ে গেলেন আপনার বহুল আকাংখিত পাসপোর্ট।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ঃ
আমার মোট খরচ হয়েছে ৩৬৫০ টাকা। ৩৪৫০ টাকা ব্যাংকে, ৩০ টাকা রিকশা ভারা ব্যাংকে যাওয়ার জন্য, ৪বার পাসপোর্ট অফিসে যাওয়া আসা বাবদ ১০০ টাকা, ফ্যাক্স করা বাবদ ৩০ টাকা, বাকি ৪০ টাকা ফোনকল, ছবি প্রিন্ট ও ফটোকপি বাবদ। 😛 একটু মজা নিলাম আর কি, হাহাহা।

এটি মূলত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট, RMC এর ছাত্রছাত্রীদের জন্য পারফেক্ট, অন্যদের জন্য ডকুমেন্ট ভিন্ন লাগতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে আগে একদিন গিয়ে ইনফরম্যাশন অফিসারের নিকট থেকে কি কি লাগবে বা কাগজ গুলো ঠিক আছে কিনা দেখে নিবেন।

পাসপোর্ট অফিসের আশে পাশে প্রচুর দালাল আছে। এরা মূলত বাহিরে যারা কাজ করতে যায় এদের টার্গেট করে। আপনি যথেষ্ট শিক্ষিত ও স্মার্ট। সুতরাং কোথায় কি লাগবে সেটা আপনি চাইলে অনলাইনেই বের করে নিতে পারবেন।

আমার নিজের অভিজ্ঞতায় যা দেখেছি, পাসপোর্ট অফিসের অফিসিয়াল লোকজন যথেষ্ট হেল্পফুল, আজাইরা প্রশ্ন না করলে এরা সঠিক ও সহজ পথ দেখিয়ে দেয়।

আমি নিজে রাজশাহীতে পাসপোর্ট করাতে গিয়ে অনেক ঝামেলার সম্মুখীন হয়েছি, তাই এটা লিখলাম যাতে আপনাদের সেগুলো পোহাতে না হয়। আমি প্রায় ৬/৭ মাস আগে পাসপোর্ট করিয়েছি তাই এখন কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে এই প্রক্রিয়ার। আপনি কোন আপডেট জেনে থাকলে কমেন্টে অবশ্যই জানাবেন। আর ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করবেন
এছাড়া কোন কিছু জানার থাকলে আমাকে ইমেইল করতে পারেন
ধন্যবাদ।

মেহেদী,
বিবিএ, মার্কেটিং বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় 
Email: hello@mdmehedi.com
Website: www.mdmehedi.com

Leave a Reply